বাংলাদেশে কৃষি ও কৃষিবিষয়ক উচ্চশিক্ষায় ভর্তি হতে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য অন্যতম বড় সুযোগ কৃষি গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা। কৃষি গুচ্ছের অধীনে রয়েছে ৯টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং মোট ৩,৭০১টি আসন।

কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে কত আসন, কারা আবেদন করতে পারবে, ভর্তি পরীক্ষায় কোন বিষয়ে কত নম্বর থাকবে, নেগেটিভ মার্কিং ও মেধাতালিকার নিয়ম কী এবং কীভাবে প্রস্তুতি নিলে এগিয়ে থাকা যাবে—এই লেখায় আবেদন থেকে চান্স পাওয়া পর্যন্ত প্রয়োজনীয় তথ্য একসঙ্গে তুলে ধরা হলো।
কৃষি গুচ্ছের ৯ বিশ্ববিদ্যালয় ও আসনসংখ্যা
১ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ ১,০০৬টি
২ গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর ৫১০টি
৩ শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা ৭০৫টি
৪ পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী ৪৫২টি
৫ চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম ২৭৫টি
৬ সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট ৪৩১টি
৭ খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা ১৫০টি
৮ হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, হবিগঞ্জ ৯০টি
৯ কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, কুড়িগ্রাম ৮২টি
সর্বমোট ৩,৭০১টি
> বিশেষ দ্রষ্টব্য: এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক মোট আসনসংখ্যা দেওয়া হয়েছে। বিভাগ ও ডিগ্রিভিত্তিক আসনবণ্টন পরবর্তী ভর্তি নির্দেশিকায় প্রকাশিত হতে পারে।
কারা আবেদন করতে পারবে?
সর্বশেষ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী আবেদনকারীকে ২০২২, ২০২৩ অথবা ২০২৪ সালে এসএসসি/সমমান এবং ২০২৫ অথবা ২০২৬ সালে এইচএসসি/সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। আবেদনকারীকে অবশ্যই বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী হতে হবে এবং জীববিজ্ঞান, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান ও গণিত বিষয় নিয়ে পাস করতে হবে।
জিপিএর ন্যূনতম শর্ত
◆ এসএসসি/সমমান ও এইচএসসি/সমমান—প্রতিটি পরীক্ষায় চতুর্থ বিষয় বাদে আলাদাভাবে ন্যূনতম জিপিএ ৪.০০ থাকতে হবে।
◆ দুই পরীক্ষায় চতুর্থ বিষয় বাদে মোট জিপিএ কমপক্ষে ৮.৫০ হতে হবে।
> সতর্কতা: দুই পরীক্ষায় মোট জিপিএ ৮.৫০ থাকলেও কোনো একটি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.০০-এর কম হলে আবেদন করা যাবে না।
ভর্তি পরীক্ষার মানবণ্টন
২০২৬ সালের এইচএসসি/সমমান পরীক্ষার সিলেবাস অনুযায়ী ১০০ নম্বরের MCQ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। পরীক্ষার সময় ১ ঘণ্টা।
ইংরেজি ১০
প্রাণিবিজ্ঞান ১৫
উদ্ভিদবিজ্ঞান ১৫
পদার্থবিজ্ঞান ২০
রসায়ন ২০
গণিত ২০
মোট ১০০
নেগেটিভ মার্কিং
প্রতিটি সঠিক উত্তরের জন্য ১ নম্বর পাওয়া যাবে এবং প্রতিটি ভুল উত্তরের জন্য ০.২৫ নম্বর কাটা হবে। তাই সম্পূর্ণ অনুমানের ভিত্তিতে উত্তর না দিয়ে প্রশ্ন ও অপশন বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
মেধাতালিকা কীভাবে তৈরি হবে?
চূড়ান্ত ফলাফল মোট ১৫০ নম্বরের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হবে।
মূল্যায়নের অংশ নম্বর
ভর্তি পরীক্ষা ১০০
এসএসসি/সমমানের ফল ২৫
এইচএসসি/সমমানের ফল ২৫
সর্বমোট ১৫০
এসএসসি ও এইচএসসির ক্ষেত্রে চতুর্থ বিষয় বাদ দিয়ে প্রাপ্ত ফলের ভিত্তিতে ২৫ নম্বর করে যোগ করা হবে। এরপর মোট নম্বর অনুসারে মেধাতালিকা ও অপেক্ষমাণ তালিকা প্রস্তুত করা হবে। অর্থাৎ ভর্তি পরীক্ষার নম্বরের পাশাপাশি এসএসসি ও এইচএসসির ফলও চূড়ান্ত মেধাক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ভর্তি পরীক্ষার কেন্দ্র নির্বাচন
ভর্তি পরীক্ষা কৃষি গুচ্ছভুক্ত ৯টি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে। প্রয়োজনে এক বা একাধিক উপকেন্দ্রও নির্ধারণ করা হতে পারে। আবেদনের সময় পরীক্ষার্থীকে ১ থেকে ৯ পর্যন্ত কেন্দ্রের পছন্দক্রম দিতে হবে।
পরীক্ষাকেন্দ্র নির্ধারণে বিবেচিত হবে—
◆ সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রে আসন খালি থাকা;
◆ আবেদনকারীর দেওয়া পছন্দক্রম;
◆ আবেদন ফি প্রদানের তারিখ ও সময়ের অগ্রাধিকার।
তাই পছন্দের কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে চাইলে আবেদন শুরু হওয়ার পর দেরি না করে আবেদন সম্পন্ন করাই ভালো।
কৃষি গুচ্ছে চান্স পেতে কীভাবে প্রস্তুতি শুরু করবে?
কৃষি গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষায় জীববিজ্ঞানের পাশাপাশি পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত ও ইংরেজির সমন্বিত প্রস্তুতি প্রয়োজন। বড় কোনো একটি বিষয় সম্পূর্ণ বাদ দিলে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই শুরু থেকেই মানবণ্টন অনুযায়ী প্রতিটি বিষয়ের জন্য সময় নির্ধারণ করতে হবে।
১. জীববিজ্ঞান—৩০ নম্বর
প্রাণিবিজ্ঞান ও উদ্ভিদবিজ্ঞান মিলিয়ে জীববিজ্ঞানে মোট ৩০ নম্বর থাকে। এটি ভর্তি পরীক্ষার সর্বোচ্চ নম্বরের অংশ।
গুরুত্বপূর্ণ টপিক:
◆ কোষ ও কোষ বিভাজন
◆ কোষ রসায়ন
◆ অণুজীব
◆ উদ্ভিদের শ্রেণিবিন্যাস
◆ উদ্ভিদ শারীরতত্ত্ব
◆ টিস্যু ও টিস্যুতন্ত্র
◆ জীবের পরিবেশ ও বিস্তার
◆ প্রাণীর বৈচিত্র্য ও শ্রেণিবিন্যাস
◆ মানবদেহের বিভিন্ন তন্ত্র
◆ জিনতত্ত্ব ও বিবর্তন
◆ রোগ প্রতিরোধ ও জীবপ্রযুক্তি
প্রতিটি অধ্যায়ের সংজ্ঞা, ব্যতিক্রম, বৈশিষ্ট্য, চিত্রের লেবেল এবং তুলনামূলক তথ্য আলাদাভাবে পড়তে হবে।
২. রসায়ন—২০ নম্বর
গুরুত্বপূর্ণ টপিক:
◆ গুণগত রসায়ন
◆ পর্যায়বৃত্ত ধর্ম
◆ রাসায়নিক বন্ধন
◆ রাসায়নিক পরিবর্তন
◆ কর্মমুখী রসায়ন
◆ পরিবেশ রসায়ন
◆ জৈব যৌগের নামকরণ ও বিক্রিয়া
◆ পরিমাণগত রসায়ন
◆ তড়িৎ রসায়ন
রসায়নে ধারণা, বিক্রিয়া এবং গাণিতিক সমস্যা—এই তিন ধরনের প্রস্তুতিই রাখতে হবে। শুধু বিক্রিয়া মুখস্থ না করে বিক্রিয়ার কারণ ও প্রয়োগ বুঝে অনুশীলন করলে ভুলের হার কমবে।
৩. পদার্থবিজ্ঞান—২০ নম্বর
গুরুত্বপূর্ণ টপিক:
◆ ভেক্টর
◆ গতিবিদ্যা ও নিউটনীয় বলবিদ্যা
◆ কাজ, শক্তি ও ক্ষমতা
◆ মহাকর্ষ
◆ পদার্থের গাঠনিক ধর্ম
◆ পর্যাবৃত্ত গতি ও তরঙ্গ
◆ তাপগতিবিদ্যা
◆ স্থির ও চল তড়িৎ
◆ আলোকবিজ্ঞান
◆ আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান
◆ সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিকস
সূত্র মুখস্থ করার পাশাপাশি কোন পরিস্থিতিতে কোন সূত্র প্রয়োগ করতে হবে, সেটি বুঝে নিয়মিত গাণিতিক সমস্যা সমাধান করতে হবে।
৪. গণিত—২০ নম্বর
গুরুত্বপূর্ণ টপিক:
◆ ম্যাট্রিক্স ও নির্ণায়ক
◆ ভেক্টর
◆ সরলরেখা ও বৃত্ত
◆ ত্রিকোণমিতি
◆ অন্তরীকরণ
◆ যোগজীকরণ
◆ জটিল সংখ্যা
◆ বহুপদী
◆ কনিক
◆ বিপরীত ত্রিকোণমিতিক ফাংশন
◆ স্থিতিবিদ্যা
◆ সমতলে বস্তুকণার গতি
◆ সম্ভাবনা
গণিতে দ্রুত ও নির্ভুলভাবে সমাধানের দক্ষতা বাড়াতে প্রতিদিন সময় নির্ধারণ করে MCQ অনুশীলন করা জরুরি।
৫. ইংরেজি—১০ নম্বর
ইংরেজিতে নম্বর তুলনামূলক কম হলেও এটি মেধাক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবধান তৈরি করতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ টপিক:
◆ Parts of Speech
◆ Subject–Verb Agreement
◆ Right Form of Verbs
◆ Preposition
◆ Voice ও Narration
◆ Sentence Correction
◆ Synonym ও Antonym
◆ Idiom and Phrase
◆ Vocabulary ও Spelling
প্রস্তুতির জন্য কোন বই পড়বে?
বিষয়ভিত্তিক ভিত্তি তৈরি, MCQ অনুশীলন, বিগত প্রশ্ন বিশ্লেষণ এবং পূর্ণাঙ্গ মডেল টেস্টের জন্য নিচের বইগুলো অনুসরণ করতে পারো—
প্রস্তুতির বিষয় জয়কলির বই
পদার্থবিজ্ঞান— পদার্থ বিচিত্রা
রসায়ন— রসায়ন বিচিত্রা
জীববিজ্ঞান— বায়োলজি বিচিত্রা
গণিত— গণিত বিচিত্রা
ইংরেজি— Exam English
সমন্বিত কৃষি প্রস্তুতি— কৃষি বিচিত্রা
বিগত প্রশ্ন ও মডেল টেস্ট— জয়কলি কৃষি প্রশ্নব্যাংক ও মডেল টেস্ট
প্রস্তুতির সঠিক ধাপ
প্রথম ধাপ: বোর্ড বই ও বিষয়ভিত্তিক বই থেকে প্রতিটি অধ্যায়ের মৌলিক ধারণা পরিষ্কার করো।
দ্বিতীয় ধাপ: গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, সূত্র, বিক্রিয়া, ব্যতিক্রম ও চিত্রভিত্তিক তথ্য আলাদা খাতায় নোট করো।
তৃতীয় ধাপ: একটি অধ্যায় শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে সেই অধ্যায়ের বিষয়ভিত্তিক MCQ সমাধান করো।
চতুর্থ ধাপ: কৃষি গুচ্ছের বিগত বছরের প্রশ্ন সমাধান করে প্রশ্নের ধরন এবং পুনরাবৃত্ত টপিক চিহ্নিত করো।
পঞ্চম ধাপ: এক ঘণ্টায় ১০০টি প্রশ্ন সমাধানের দক্ষতা তৈরির জন্য নিয়মিত পূর্ণাঙ্গ মডেল টেস্ট দাও।
ষষ্ঠ ধাপ: প্রতিটি মডেল টেস্টের ভুল প্রশ্নের কারণ বিশ্লেষণ করো এবং সংশ্লিষ্ট অধ্যায় পুনরায় পড়ো।
দৈনিক প্রস্তুতির নমুনা রুটিন
প্রস্তুতির অংশ প্রস্তাবিত সময়
জীববিজ্ঞান ১ ঘণ্টা ৩০ মিনিট
রসায়ন ১ ঘণ্টা
পদার্থবিজ্ঞান ১ ঘণ্টা
গণিত ১ ঘণ্টা
ইংরেজি ৩০ মিনিট
বিগত প্রশ্ন ও ভুল বিশ্লেষণ ১ ঘণ্টা
নিজের শক্তি ও দুর্বলতা অনুযায়ী সময় কমবেশি করা যাবে। তবে প্রতিদিন সব বিষয়ের সঙ্গে সংযোগ রাখা ভালো। কোনো বিষয়ে দুর্বলতা বেশি থাকলে সেই বিষয়ের জন্য অতিরিক্ত সময় নির্ধারণ করতে হবে।
যেসব ভুল এড়িয়ে চলবে
◆ শুধু জীববিজ্ঞান পড়ে পদার্থবিজ্ঞান ও গণিত অবহেলা করা;
◆ বোর্ড বই বাদ দিয়ে কেবল প্রশ্ন মুখস্থ করা;
◆ নেগেটিভ মার্কিং বিবেচনা না করে অতিরিক্ত উত্তর দেওয়া;
◆ বিগত বছরের প্রশ্ন বিশ্লেষণ না করা;
◆ মডেল টেস্ট দেওয়ার পর ভুলগুলো পুনরায় না দেখা;
◆ শেষ সময়ে অনেক নতুন অধ্যায় পড়ার চাপ নেওয়া;
◆ আবেদন করতে দেরি করে পছন্দের পরীক্ষাকেন্দ্র হারানো।
শেষ কথা
কৃষি গুচ্ছে মোট ৩,৭০১টি আসন থাকলেও প্রতিযোগিতা হবে দেশজুড়ে। তাই শুধু ন্যূনতম যোগ্যতা অর্জন বা পাস নম্বর পাওয়ার চিন্তা করলে চলবে না; লক্ষ্য হতে হবে শক্তিশালী মেধাক্রম তৈরি করা।
বোর্ড বইয়ের ভিত্তি, বিষয়ভিত্তিক অনুশীলন, বিগত প্রশ্ন এবং নিয়মিত মডেল টেস্ট—এই চারটির সমন্বয়েই কৃষি গুচ্ছে একটি আসনের স্বপ্ন বাস্তব হতে পারে। গোছানো প্রস্তুতি শুরু হোক জয়কলির নির্ভরযোগ্য বইয়ের সঙ্গে।
> তথ্যসূত্র: কৃষি গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা ২০২৫–২৬-এর অফিসিয়াল ভর্তি বিজ্ঞপ্তি। পরবর্তী শিক্ষাবর্ষে নিয়ম, যোগ্যতা বা আসনসংখ্যা পরিবর্তিত হলে সর্বশেষ অফিসিয়াল বিজ্ঞপ্তিই চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে।
ট্যাগ: কৃষি গুচ্ছ, কৃষি ভর্তি পরীক্ষা, Agriculture Cluster, Agriculture Admission, কৃষি বিচিত্রা, পদার্থ বিচিত্রা, রসায়ন বিচিত্রা, বায়োলজি বিচিত্রা, গণিত বিচিত্রা, Exam English, জয়কলি




মন্তব্য ও উত্তর
মন্তব্য লোড হচ্ছে…