ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিভাগ। প্রতিবছর অসংখ্য শিক্ষার্থী এই বিভাগে পড়ার স্বপ্ন নিয়ে কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়। তবে শুধু ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় পাস করলেই আইন বিভাগে ভর্তির সুযোগ পাওয়া যায় না। আইন বিভাগের জন্য নির্ধারিত বিষয়ভিত্তিক ন্যূনতম নম্বরের শর্তও পূরণ করতে হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিটের ভর্তি নির্দেশিকা অনুযায়ী, আইন বিভাগে বিবেচিত হতে হলে বাংলা, ইংরেজি ও সাধারণ জ্ঞান—তিনটি বিষয়েই নির্ধারিত ন্যূনতম নম্বর পেতে হবে। একই সঙ্গে ইউনিটের সাধারণ পাসের শর্ত পূরণ এবং মেধাতালিকায় ভালো অবস্থান করা জরুরি।
আইন বিভাগে বিবেচিত হওয়ার বিষয়ভিত্তিক শর্ত
আইন বিভাগে ভর্তির জন্য একজন পরীক্ষার্থীকে ভর্তি পরীক্ষায় বিষয়ভিত্তিকভাবে নিচের ন্যূনতম নম্বর অর্জন করতে হবে—
◆ বাংলায় ন্যূনতম ১৬ নম্বর
◆ ইংরেজিতে ন্যূনতম ২১ নম্বর
◆ সাধারণ জ্ঞানে ন্যূনতম ১৫ নম্বর
বাংলা ও ইংরেজির নম্বর নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের MCQ ও লিখিত অংশের প্রাপ্ত নম্বর একসঙ্গে যোগ করা হবে। অর্থাৎ শুধু MCQ অংশে ভালো করলেই হবে না; বাংলা ও ইংরেজির লিখিত অংশেও ভালো প্রস্তুতি থাকতে হবে।
ইউনিটের সাধারণ পাসের শর্ত
আইন বিভাগের বিষয়ভিত্তিক শর্ত পূরণের পাশাপাশি কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার সাধারণ পাসের শর্তও পূরণ করতে হবে। মোট ১০০ নম্বরের ভর্তি পরীক্ষায় একজন শিক্ষার্থীকে কমপক্ষে ৪০ নম্বর পেতে হবে। একই সঙ্গে লিখিত অংশে নির্ধারিত পাসের শর্তও পূরণ করতে হবে।
কোনো শিক্ষার্থী মোট পরীক্ষায় ৪০ বা তার বেশি নম্বর পেলেও বাংলা, ইংরেজি অথবা সাধারণ জ্ঞানের নির্ধারিত ন্যূনতম নম্বর অর্জন করতে না পারলে আইন বিভাগের জন্য বিবেচিত হবে না।
গুরুত্বপূর্ণ: বাংলা ১৬, ইংরেজি ২১ এবং সাধারণ জ্ঞান ১৫—আইন বিভাগে বিবেচিত হওয়ার ন্যূনতম শর্ত। এই নম্বরগুলো অর্জন করলেই আইন বিভাগে চান্স নিশ্চিত হবে না।
আইন বিভাগে মোট আসন কত?
২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি নির্দেশিকা অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে মোট আসন ১১০টি। বিভাগভেদে আসনবিন্যাস নিচে দেওয়া হলো—
মানবিক শাখা ৫২
বিজ্ঞান শাখা ৪৩
ব্যবসায় শিক্ষা শাখা ১৫
মোট১১০
আসনসংখ্যা সীমিত হওয়ায় শুধু ন্যূনতম নম্বর অর্জন করে নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ নেই। আইন বিভাগ পেতে হলে অন্য প্রতিযোগীদের তুলনায় বেশি নম্বর অর্জন করে মেধাতালিকায় ভালো অবস্থান তৈরি করতে হবে।
আইন বিভাগে চান্স কীভাবে নির্ধারিত হবে?
আইন বিভাগে একজন শিক্ষার্থীর সুযোগ পাওয়ার বিষয়টি প্রধানত চারটি শর্তের ওপর নির্ভর করবে—
◆ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া
◆ বাংলা, ইংরেজি ও সাধারণ জ্ঞানে নির্ধারিত ন্যূনতম নম্বর পাওয়া
◆ মেধাতালিকায় প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে থাকা
◆ বিষয় পছন্দের ফরমে আইন বিভাগ নির্বাচন করা
ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর বিষয় পছন্দক্রম পূরণের সুযোগ দেওয়া হলে আইন বিভাগকে পছন্দের তালিকায় রাখতে হবে। একজন শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় নম্বরের শর্ত পূরণ করলেও বিষয় পছন্দের তালিকায় আইন বিভাগ না রাখলে তাকে এই বিভাগে মনোনয়ন দেওয়া হবে না।
চূড়ান্ত বিষয় মনোনয়ন নির্ভর করবে শিক্ষার্থীর মেধাক্রম, শাখাভিত্তিক আসনসংখ্যা, বিষয় পছন্দক্রম এবং সংশ্লিষ্ট সময়ের ভর্তি নীতিমালার ওপর।
প্রস্তুতিতে কোন বিষয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবে?
আইন বিভাগে বিবেচিত হতে ইংরেজিতে সর্বোচ্চ ২১ নম্বরের ন্যূনতম শর্ত রয়েছে। তাই ইংরেজিকে প্রস্তুতির কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে নিতে হবে। তবে বাংলা ও সাধারণ জ্ঞান অবহেলা করলে চলবে না। তিনটি বিষয়ের যেকোনো একটিতে নির্ধারিত নম্বরের কম পেলে আইন বিভাগে ভর্তির সুযোগ নষ্ট হতে পারে।
বাংলা প্রস্তুতি
বাংলায় MCQ ও লিখিত—দুই অংশের জন্যই সমন্বিত প্রস্তুতি নিতে হবে। ব্যাকরণ, সাহিত্য, লেখক-রচনা, শব্দভান্ডার, বাক্যশুদ্ধি এবং গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক তথ্য নিয়মিত পড়তে হবে। লিখিত অংশে শুদ্ধ বানান, বাক্যগঠন, অনুচ্ছেদ ও প্রশ্নের চাহিদা অনুযায়ী সংক্ষিপ্ত উত্তর লেখার অনুশীলন প্রয়োজন।
ইংরেজি প্রস্তুতি
ইংরেজিতে ন্যূনতম ২১ নম্বর অর্জনের শর্ত থাকায় Grammar, Vocabulary, Sentence Correction, Appropriate Preposition, Phrase and Idiom, Synonym-Antonym ও Reading Comprehension নিয়মিত অনুশীলন করতে হবে।
লিখিত অংশের জন্য Paragraph, Summary, Translation, Sentence Making এবং প্রশ্নের ধরন অনুযায়ী অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হাতে লিখে অনুশীলন করা উচিত। শুধু নিয়ম মুখস্থ না করে প্রশ্ন সমাধানের মাধ্যমে নিয়মের প্রয়োগ শিখতে হবে।
সাধারণ জ্ঞান প্রস্তুতি
সাধারণ জ্ঞানে ন্যূনতম ১৫ নম্বর পেতে হলে বাংলাদেশ বিষয়াবলি ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলির প্রস্তুতি সমানভাবে নিতে হবে। বাংলাদেশের ইতিহাস, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, সংবিধান, সরকারব্যবস্থা, অর্থনীতি, ভূগোল ও সংস্কৃতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থা, সাম্প্রতিক বিশ্ব, গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি এবং বৈশ্বিক ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে।
আইন বিভাগ লক্ষ্য হলে বাংলাদেশের সংবিধান, বিচারব্যবস্থা, মৌলিক অধিকার, গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনসংশ্লিষ্ট সাধারণ তথ্য বাড়তি গুরুত্ব দিয়ে পড়া যেতে পারে।
লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতি কীভাবে নেবে?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় লিখিত অংশ ভালো করার জন্য নিয়মিত হাতে লেখার বিকল্প নেই। অনেক শিক্ষার্থী MCQ অংশের প্রস্তুতিতে বেশি সময় দিলেও লিখিত অনুশীলন যথেষ্ট করে না। ফলে জানা প্রশ্নের উত্তরও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গুছিয়ে লিখতে পারে না।
প্রতিদিন বাংলা ও ইংরেজি থেকে অন্তত কয়েকটি লিখিত প্রশ্নের উত্তর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লেখার অভ্যাস করতে হবে। লেখার পর বানান, বাক্যগঠন, ব্যাকরণ, তথ্যের যথার্থতা এবং সময় ব্যবস্থাপনা যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে উত্তর অপ্রয়োজনীয়ভাবে বড় না করে প্রশ্নের চাহিদা অনুযায়ী সংক্ষিপ্ত ও তথ্যপূর্ণ রাখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
বিগত বছরের প্রশ্ন কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বিগত বছরের প্রশ্ন সমাধান করলে প্রশ্নের ভাষা, গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, বারবার আসা টপিক এবং লিখিত প্রশ্নের ধরন সম্পর্কে বাস্তব ধারণা পাওয়া যায়। কোন বিষয়ে নিজের দুর্বলতা বেশি, সেটিও সহজে শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
প্রথমে বিষয়ভিত্তিক ভিত্তি তৈরি করতে হবে। এরপর অধ্যায়ভিত্তিক প্রশ্ন অনুশীলন এবং বিগত বছরের প্রশ্ন সমাধান করতে হবে। প্রস্তুতির শেষ পর্যায়ে নির্ধারিত সময় ধরে পূর্ণাঙ্গ মডেল টেস্ট দিয়ে নিজের অবস্থান যাচাই করা উচিত।
প্রস্তুতির জন্য জয়কলি'র এক সেট বই
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ লক্ষ্য করে বিষয়ভিত্তিক প্রস্তুতি নিতে অনুসরণ করা যেতে পারে জয়কলির নিচের বইগুলো—
প্রস্তুতির বিষয়সহায়ক বই বাংলা বিচিত্রা, Exam English, সাধারণ জ্ঞান জয়কলি GK, লিখিত অনুশীলন WRITTEN মানবিক, জয়কলি প্রশ্নব্যাংক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়(মানবিক)।
বাংলা বিচিত্রা থেকে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও ব্যাকরণের বিষয়ভিত্তিক প্রস্তুতি নেওয়া যাবে। Exam English ইংরেজি Grammar, Vocabulary ও ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন অনুশীলনে সহায়তা করবে। বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলির প্রস্তুতিতে অনুসরণ করা যেতে পারে জয়কলি GK।
বাংলা ও ইংরেজির লিখিত অংশ নিয়মিত অনুশীলনের জন্য পড়া যেতে পারে WRITTEN মানবিক। সবশেষে প্রশ্নের ধরন বোঝা, বিগত বছরের প্রশ্ন সমাধান এবং সময় ধরে মডেল টেস্ট দেওয়ার জন্য অনুসরণ করা যেতে পারে জয়কলি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশ্নব্যাংক ও মডেল টেস্ট।
একটি কার্যকর প্রস্তুতি পরিকল্পনা
প্রস্তুতির শুরুতে বাংলা, ইংরেজি ও সাধারণ জ্ঞানের মৌলিক বিষয়গুলো শেষ করতে হবে। প্রতিদিন তিনটি বিষয় থেকেই নির্দিষ্টসংখ্যক MCQ সমাধান করা উচিত। বাংলা ও ইংরেজির লিখিত উত্তর নিয়মিত হাতে লিখে অনুশীলন করতে হবে।
প্রতিটি অনুশীলন বা মডেল টেস্টের পর ভুল প্রশ্নগুলো আলাদা খাতায় লিখে রাখতে হবে। ভুলের কারণ বুঝে সংশ্লিষ্ট অধ্যায় পুনরায় পড়লে একই ভুল বারবার হওয়ার আশঙ্কা কমে যাবে। সপ্তাহে অন্তত একটি পূর্ণাঙ্গ মডেল টেস্ট দিয়ে নম্বর, সময় ও নির্ভুলতা—এই তিনটি বিষয় বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।
আইন বিভাগে প্রতিযোগিতা বেশি হওয়ায় প্রস্তুতির লক্ষ্য শুধু ন্যূনতম শর্ত পূরণ করা হওয়া উচিত নয়। বাংলা, ইংরেজি ও সাধারণ জ্ঞানের প্রতিটি অংশে নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি নম্বর অর্জনের লক্ষ্য রাখতে হবে।
শেষ কথা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে চান্স পেতে শুধু ভর্তি পরীক্ষায় পাস করাই যথেষ্ট নয়। বাংলায় ন্যূনতম ১৬, ইংরেজিতে ২১ এবং সাধারণ জ্ঞানে ১৫ নম্বর পাওয়ার শর্ত পূরণ করতে হবে। পাশাপাশি ইউনিটের সাধারণ পাসের শর্ত পূরণ, মেধাতালিকায় ভালো অবস্থান এবং বিষয় পছন্দক্রমে আইন বিভাগ নির্বাচন করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, ১৬–২১–১৫ আইন বিভাগে বিবেচিত হওয়ার ন্যূনতম শর্ত—চান্স পাওয়ার নিশ্চয়তা নয়। সীমিত আসনের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে লক্ষ্য রাখতে হবে আরও বেশি নম্বর অর্জনের দিকে।
বিষয়ভিত্তিক প্রস্তুতি, নিয়মিত লিখিত অনুশীলন, বিগত বছরের প্রশ্ন সমাধান এবং সময় ধরে মডেল টেস্ট—এই চারটির সমন্বয়ই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে পড়ার স্বপ্নকে বাস্তবের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে।
তথ্যসূত্র: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিটের ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি নির্দেশিকা।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই লেখার নম্বরের শর্ত ও আসনসংখ্যা ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের নির্দেশিকার ভিত্তিতে প্রস্তুত। পরবর্তী শিক্ষাবর্ষে ভর্তি নীতিমালা, আসনসংখ্যা বা বিভাগভিত্তিক শর্ত পরিবর্তিত হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ অফিসিয়াল নির্দেশনাই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। ভর্তি প্রস্তুতি হোক জয়কলি'র সাথে।




মন্তব্য ও উত্তর
মন্তব্য লোড হচ্ছে…